ঢাকা, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

রেলের হাসপাতালকে রোগী বানিয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক নির্ভরতা লজ্জাজনক

মনিরুজ্জামান মনির

প্রকাশ: ২২:৪৬, ৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৪৭, ৪ অক্টোবর ২০২৬

রেলের হাসপাতালকে রোগী বানিয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক নির্ভরতা লজ্জাজনক

বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব হাসপাতাল ও চিকিৎসা অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের রোগ নির্ণয়ের জন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে চুক্তিকে রেলওয়ের চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা ও পরনির্ভরশীলতার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট মনিরুজ্জামান মনির।

সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল ও পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, রাজশাহী-এর মধ্যে তিন বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের আইনগত নির্ভরশীলদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

চুক্তিপত্র অনুযায়ী, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ, বিভিন্ন ইমেজিং ও হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষায় ২০ শতাংশ, CT/MRI, USG, ECG, EEG, ETT, ENT, Colour Doppler ও Echo 2D-সহ নির্দিষ্ট কয়েকটি পরীক্ষায় ২৫ শতাংশ এবং কিছু বিশেষ পরীক্ষায় ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার কথা রয়েছে। সুবিধাভোগীদের মধ্যে কর্মচারীর স্বামী/স্ত্রী, নির্ভরশীল সন্তান এবং বাবা-মাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে কর্মচারীর পরিচয়পত্র প্রদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে এসব ছাড়কে রেলওয়ের জন্য বিশেষ কোনো অর্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন মনিরুজ্জামান মনির। তিনি বলেন, “বিভিন্ন নামিদামি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সারা বছরই বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ১০, ২০, ২৫ এমনকি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ও প্যাকেজ সুবিধা দিয়ে থাকে। ফলে বাজারে প্রচলিত এ ধরনের ছাড়কে রেলওয়ের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখানোর আগে চুক্তির মাধ্যমে রেলওয়ে প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত কী সুবিধা পেল, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “আমাদের প্রশ্ন চুক্তির বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্ন হলো—রেলওয়ের নিজস্ব হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়ন না করে কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে? একসময় রেলওয়ের নিজস্ব হাসপাতালগুলো ছিল শ্রমিক-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। আজ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধার অভাবে অনেক হাসপাতালই যেন নিজেরাই রোগীতে পরিণত হয়েছে। এটি রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।”

মনিরুজ্জামান মনির আরও বলেন, রেলকর্মীদের জন্য শুধু পরীক্ষায় ছাড় নয়, প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, জরুরি চিকিৎসাসেবা, আধুনিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি যদি সাময়িক সহায়ক ব্যবস্থা হয়, তা থাকতে পারে; কিন্তু এর মাধ্যমে রেলওয়ের নিজস্ব চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্থায়ী করা যাবে না।

তিনি বলেন, “একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হাসপাতাল থাকবে, অথচ কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে যেতে হবে—এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসানীতি হতে পারে না। রেলওয়ের হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।”

বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি বলেন, “রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারীরা দিন-রাত দায়িত্ব পালন করে দেশের রেল যোগাযোগ সচল রাখেন। তাঁদের চিকিৎসা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। ২০ বা ৪০ শতাংশ ছাড় দিয়ে এই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।”

তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের প্রতি রেলওয়ের নিজস্ব হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা যাচাই করে আধুনিকায়নের জন্য সময়বদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।

মনিরুজ্জামান মনির বলেন, “রেলওয়ের হাসপাতালকে রোগী বানিয়ে কর্মচারীদের চিকিৎসার জন্য অন্যের দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গৌরব হতে পারে না। রেলওয়ের চিকিৎসাব্যবস্থা চুক্তিনির্ভর নয়, আধুনিক, মানসম্মত ও স্বনির্ভর হওয়া উচিত।”

মনিরুজ্জামান মনির
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন